যাকাতের হিসাব নির্ধারণে সোনা-রুপা অল্পবিস্তর পর্যালোচনা
যাকাতের নিসাব নির্ধারণে অনেকেই নিয়তগত প্রবঞ্চনার আশ্রয় নেন। দুঃখজনক
হলেও এটি হয়ে আসছে। দুদিন আগেও কোনো এক ভাইয়ের পোস্টে একজনের মন্তব্য ছিল এমন, “আপনি শুধু রুপা রুপা করেন কেন? নিসাব নির্ধারণে স্বর্ণকেও তো স্ট্যান্ডার্ড ধরা যায়। আমি যদি স্বর্ণকে মানদণ্ড ধরে নিসাব নির্ধারণ করি তাহলে সমস্যা কোথায়?"পুঁজিবাদী এই অর্থব্যবস্থায় রুপাকে পাশ কাটিয়ে স্বর্ণকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে যাকাতের নিসাব নির্ধারণ করতে গেলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক সমস্যা তৈরি হবে। এটা বুঝতে হলে আমাদেরকে সোনা-রুপার একটি ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে চোখ রাখা জরুরি।
মিশরের ফিরাউনী যুগে সোনা-রুপার অনুপাত ছিল ২.৫ঃ১। মেসোপটেমিয়ার হাম্বুরাবির আমলে সোনা-রুপার অনুপাত ছিল ৬ঃ১। গ্রিক সাম্রাজ্যে সোনা-রুপার অনুপাত ছিল ১২.৫ঃ১। রুমান সাম্রাজ্যে সোনা-রুপার অনুপাত ছিল ১২.৫ঃ১।
আল্লাহর ﷺ-এর যুগে কেন্দ্রীয় ভাবে সোনা-রুপার মান নির্ধারিত ছিল। তখন সোনা-রুপার অনুপাত ছিল ৭ঃ১। অর্থাৎ সাত তোলা রুপার সমমান এক তোলা সোনা। রাসূল ﷺ-এর যুগে ৫২.৫ তোলা রুপার সমমান ছিল ৭.৫ তোলা সোনা।
মধ্যযুগ পর্যন্ত সোনা-রুপার অনুপাত ছিল ১৫ঃ১। ১৭৯২ সালে জর্জ ওয়াশিংটন সোনা-রুপার মান নির্ধারণ করেন। তখন নির্ধারিত অনুপাত ছিল ১৫ঃ১।
১৯২২ সালের পর থেকে সোনার দাম একপেশে বাড়তে থাকে। কারণ তখন মুদ্রামান নির্ধারিত হত গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ধরে। এটা চলতে থাকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন শেষ পেরেকটা ঠুকে দেয়। মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে সোনাকে গায়েব করে বাবুবীয় ফিয়াট কারেন্সি প্রবর্তন করে। ১৯৭১ সালের পর থেকে কোনো সরকার সোনা-রুপার দাম নির্ধারণে মাথা ঘামায়নি। প্রয়োজনও হয়নি। মুদ্রা ব্যবস্থার স্ট্যান্ডার্ড এখন সোনা-রুপা নয়; কাগুজে ডলার। যুক্তরাষ্ট্র কাগজ দিয়ে ডলার ছাপিয়ে তা দিয়ে অন্যান্য দেশ থেকে মূল্যবান সম্পদ হাতিয়ে এখন হয়েছে বিশ্ব মোড়ল। যাক সে কথা।
যেহেতু সোনা-রুপা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় সেহেতু এই দুটো আল্লাহ প্রদত্ত বিনিময় মাধ্যম এখন কালো বাজারিদের নিয়ন্ত্রণে। পৃথিবীর বাঘাবাঘা অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত সোনা নিয়ে খেলে মহা খেলা। আমরা বলদের মতো কাগজের নোট ব্যাংকে জমালেও তারা ঠিকই সোনা কিনে দাম নিয়ে কারসাজি করে। বিশ্বে রয়েছে শক্তিশালী গোল্ড মার্কেট। করোনা মহামারিতে যখন সবকিছুর দাম তলানি ছুঁইছুঁই, তখন একমাত্র সোনার দাম আকাশ ছুঁইছুঁই। গত মার্চ মাসে সোনা দামের ক্ষেত্রে ৫০০০ বছরের ইতিহাস টপকিয়ে নতুন এক ইতিহাস তৈরি করেছে। কেউ জানি এটা?
মার্চের ১৮ তারিখে সোনা-রুপার অনুপাত ছিল ১২৫:১। ঠিক তখন ১২৫ ভরি রুপার মূল্য দিয়ে এক ভরি সোনা ক্রয় করা সম্ভব ছিল। যদিও পরে আবার কমে আসে। কমলেও ৮০:১ এর নিচে আসেনি। অথচ ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত এই রেশিও ছিল ১৭:১। মানে ১৭ ভরি রুপার মূল্য দিয়ে ১ ভরি সোনা ক্রয় করা যেতো।
রুপা তার আগের জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে। রুপা নিয়ে বাড়াবাড়ি কমই হয়। এখন ভালো মানের ১ ভরি রুপার দাম ৮০০ টাকার উপরে নয়। সে হিসাবে ৫২.২ তোলা রুপার মূল্য হয় মাত্র ৪২ হাজার টাকা।
পক্ষন্তরে এক ভরি সোনার দাম নুন্যতন ৫৫ হাজার টাকা। সাড়ে সাত তোলার দাম পড়বে ৪ লাখ ১২ হাজার টাকা।
মোটকথা হচ্ছে, সোনা এখন কালো বাজারিদের নিয়ন্ত্রণে। সেন্ট্রাল মনিটরিং নেই বললেই চলে। যখন খুশি তখনই বাড়ছে। দেখার কেউ নেই। আবার ঐ চক্রের কেনার সিজনে দাম ধপ করে কমে যায়।
এমতাবস্থায় আপনি যদি শুধু সোনাকে মানদণ্ড ধরে যাকাতের নিসাব নির্ধারণের চেষ্টা করেন তাহলে অধিকাংশ মানুষের নিসাব পূর্ণ হবে না। বছরান্তে সব খরচ বাদে ৪ লাখ টাকা আয় করার মতো লোকের সংখ্যা অনেক কম। আর তখন যাকাত দাতাদের সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমে যাবে। গরীব তার অধিকার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে।
আর যদি রুপাকে নিসাবের মানদণ্ড ধরা হয় তাহলে অধিকাংশ মানুষ যাকাত প্রদানের সুযোগ পাবে। গরীবরা তাদের প্রাপ্য ফিরে পাবে। যাকাতের উদ্দেশ্য হচ্ছে দারিদ্রবিনোচন। রুপার মূল্য অনুসরণ করে নিসাব নির্ধারণ করলেই যাকাতের উদ্দেশ্য পূরণ হবে।
এখন আপনি যদি যাকাত না দেওয়ার বাসনায় নিয়তে যথেষ্ট অশুদ্ধতা তৈরি করে রুপাকে পাশ কাটিয়ে স্বর্ণ নিয়ে পড়ে থাকেন তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখুন, আল্লাহ অন্তর্যামী। ইন্নাল্লাহা আলিমুম বিযাতিস সুদূর।
আল্লাহর রাসুল ﷺ যাকাতের নিসাব নির্ধারণে দুটো মানদণ্ডের একটি অনুসরণ করতে বলেছেন। সোনা অথবা রুপা। যেহেতু সোনা নিয়ে বৈশ্বিক কারসাজি চলছে সেহেতু নিজেদের সেইফের জন্য দ্বিতীয় অপশন ব্যবহার করতে হবে। সোনার মানদণ্ডে যদি আমি যাকাত প্রদানকারীর যোগ্যতা অর্জন না করি তাহলে রুপার মানদণ্ড ধরে হিসাব করতে হবে। অথবা প্রথমেই রুপাকে মানদণ্ড ধরে হিসাব করতে হবে।

Comments
Post a Comment